কুহেলিকা- পর্ব-০১

0
975

সদ্য ছাব্বিশে ছুঁই ছুঁই অামি যখন ক্যারিয়ার অার প্রেমিকাকে বিয়ে করার স্বপ্নে মগ্নচেতনায় থাকতাম সব সময়, তখন ই পরিবারের চাপে পড়ে অামার মৃত বড় ভাইয়ের বউ কে বিয়ে করতে হয়। বলতে গেলে বিয়েতে অামার মতামতের দাম তো পরের কথা অামার মতামত জানতেও পর্যন্ত চায়নি অামার বাবা।

বিয়ের কয়েক মাসের মাঝে বিধবা হয়ে যাওয়া কুহেলীর মুখের দিকে চেয়ে হয়তো বাবার এমন সিদ্ধান্ত। বাবার সিদ্ধান্তের কাছে অামার ভালো লাগা, মন্দ লাগা সব ছিলো বৃথা।

বাবার চাপে পড়ে অামি তখন বিয়ে টা করে নিই। ভেবেছি কয়দিন পর তো এমনিতেই চাকরীর কাজে অামেরিকা চলে যাবো। তখন সেখানে গিয়ে কয়দিন পর নাহয় ডিভোর্সের কথা বলে দিবো।

সব প্ল্যান করে রেখেই সেদিন বিয়ে টা করে নিই মনের অমতে গিয়েই।

রাত ১০ টায় যখন ভাবি সম্পর্কের মহিলারা হাজার ঠাট্টা, মজা করে অামায় বাসর ঘরে ঢুকাচ্ছিলো, তখনও বাবার উপর জমে থাকা হাজার রাগ অামি কুহেলীর উপর ছাড়বো বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা নিচ্ছিলাম।

কিন্তু বাসর ঘরে ঢুকেই অামি চমকে গেলাম কুহেলীর কথা শুনে। অামাকে ঢুকতে দেখেই ও বলে উঠলো,

অামি জানি অাপনি অামাকে মন থেকে মেনে নেন নি। অার অামি চাইও না অাপনার ক্ষতি হোক এমন কিছু অাপনি করুন। অার অামি অাশাও করিনা অামার মত অানস্মার্ট, গেঁয়ো একটা মেয়েকে অাপনার কখনো পছন্দ হবে। কয়দিন পর তো বিদেশ চলে যাচ্ছেন। বিদেশ যাওয়ার পর হয়তো অার কখনো অামাদের দেখা নাও হতে পারে। অামি কখনো অধিকার দেখাতেও অাসবোনা। অাপনি অাপনার মত করে চলতে পারেন।

এই বলেই কুহেলী বারান্দায় চলে গেলো। অার অামি তখন অামার সকল রাগ ঝেড়ে, তার এসবকে ন্যাকামি ভেবে ঘৃণা জন্মাতে লাগলাম তার উপর।

রাত কখন ঘুম এসেছিলো অামার মনে নেই। শুধু মনে অাছে শেষ রাতে চুড়িভরা একজোড়া হাত অামার গায়ে কাথা টেনে দিয়েছিলো।

সকালে খুব বেলা করে ঘুম থেকে উঠি। নাস্তার টেবিলে গিয়ে দেখি কুহেলী কালো রঙের একটা শাড়িতে নিজেকে অাচ্ছন্ন করেছে। সাথে ছিলো সবুজ রঙের ব্লাউজ।
কালো শাড়ির সাথে সবুজ ব্লাউজ, দেখতে যে কতটা বাজে লাগছিলো তা দেখে অামার তার উপর অারো বেশি ঘৃণা হচ্ছিলো তখন। রাগে তখন নাস্তা না করেই বের হয়ে গেলাম।


সারাদিন অার বাড়ি ফিরিনি। বাড়ি ফিরতেই রাগ হচ্ছিলো। ফের কুহেলীর চেহারা দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না। ভেবেছি অাজ সন্ধ্যায় ই ঢাকায় ফিরে যাবো। 
বাড়ি ফিরেই বাবাকে বললাম,
— বাবা অামার জরুরী কাজ অাছে। অাজই ঢাকা ফিরতে হবে।

অামার কথা শুনে বাবা যেন অাকাশ থেকে পড়লো। অদ্ভুতভাবে অবাক হওয়া স্বরে বললো,
— কিহহ! কাল বিয়ে করলি অার অাজ তোর জরুরী কাজ? কাজ কাজ বলে সারাজীবনও তুই গ্রামে অাসতিনা। অার এখন তো বিয়ে করেছিস, এখন অন্তত কাজ কমা।
— বাবা কয়দিন পর অামায় অামেরিকা যেতে হবে, এখন কালকের মাঝেই কিছু কাজ সারতে হবে। 
— ওহ হো অাচ্ছা।

বাবার এমন কথা শুনে যখন অামি মনে মনে খুশি হয়ে ভাবলাম,যাক এই বুঝি রাজি হলো, ঠিক তখন ই অামার একটু খুশি টাকে হাজার রাগে ভরিয়ে দিয়ে বাবা বললো,

— অাচ্ছা বাউকেও নিয়ে যা। অার তো একটা মাস। এই কয়টা দিন এক সাথে থাক তোরা।

বাবার এমন কথা তে তখন অামি মুখের সব শব্দ হারিয়ে ফেলেছিলাম। হয়তো বাবার উপর অভিমানে অার নয়তো শ্রদ্ধাবোধের জন্য এমন হয়েছিলো।

অনেক অনিচ্ছা সত্বেও কুহেলীকে সেদিন অামি ঢাকায় নিয়ে যাই।

ওর জন্য অামাকে অনেকগুলো টেনশানের বাড়তি চাপ নিতে হয়। 
ওর কথা এখনো মিতু জানে না। এই জন্য। ও শুনলে ওর তখন কি করবে তা নিয়ে অামার অনেক চিন্তা হচ্ছিলো। কোন মেয়েই বা চাইবে তার প্রেমিক বিয়ে করুক। যদিও অামি নিজ ইচ্ছেয় করিনি, তাও মিতু কে তো এটা মানানো যাবেনা। অনেক কিছু ভাবার পর সিদ্ধান্ত নিলাম মিতু কে কুহেলীর কথা বলা যাবেনা।

বাসায় ঢুকেই কুহেলী অামার ৩ রুমের পুরো বাসাটা ঘুরে দেখলো।
দেখা শেষে এসে বললো,
— বেশ গুছানো। অাপনি করেন সব কাজ? 
— অামি কখনো অগোছালো পছন্দ করিনা। অার অামার সাথে দরকার ছাড়া কথা বলতে অাসবেনা। তোমাকে এখানে এনেছি মানে এই না যে, তুমি অামার থেকে কোনো মর্যাদা পাবে।

কথাটা বলেই অামি রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। ওর কথা শুনলেও অামার কেমন গা ঘিনঘিন করে।

সন্ধ্যে নাগাত অামি বের হলাম মিতুর সাথে দেখা করতে। অনেকদিন দেখা হয়নি। ভাবলাম, একসাথে ডিনার করেই ফিরবো। অার তাছাড়া বাসায় অামার এক মিনিটও মন টিকছে না।

অামাকে দেখেই মিতু খুশিতে জড়িয়ে ধরলো। ওকে দেখে অামি ভুলে গেলাম বিয়ে নামক কষ্টের কথা।

মিতু অনেকটা মর্ডান মেয়ে। বলতে গেলে অলরাউন্ডার। শিক্ষিত, স্টাইলিশ, সুন্দরী। সব ই অাছে তার। দীর্ঘ ছয় মাসের সম্পর্কে কখনো অামি ওকে ইমপার্ফেক্ট হয়ে থাকতে দেখিনি।

ডিনার, একটু ঘুরাঘুরি সব শেষে রাত ১১ টায় বাসার গেইটে অাসার পর অামার মনে পড়লো, কুহেলি দুপুরের পর অার কিছুই খায়নি।
মানবতার খাতীরে একটু মায়া জন্ম নিলেও অাশেপাশে কোনো খাবারের হোটেল না থাকায় কিছু কিনে নিতে পারিনি।

খালি হাতে অাসায় কিছুটা দ্বিধায় ভুগছিলাম ডোরবেল টিপতে। কিন্তু পরে ভাবলাম, এত দ্ধিধা হবে কেনো অামার। অামার তো ওর কোনোকিছুই কেয়ার করা উচিত নয়। ও খেয়েছি কি না খেয়েছে তাও না।
অনেকক্ষণ পর্যন্ত ডোরবেল বাজানোর পর যখন কুহেলী দরজা খুললো, অামি দেখলাম ওর লম্বা খোলা চুল গুলো অবাধ্যভাবে এলোমেলো হয়ে অাছে। শাড়িটা অনেকটা অগোছালো হয়ে ছিলো। দেখেই বুঝা যাচ্ছে ঘুমাচ্ছিলো। কিন্তু অাশ্চর্য ব্যাপার হলো এমন অগোছালোভাবে ওকে সুন্দর দেখাচ্ছিলো । নিজের অজান্তেই কিছু সময় অপলকভাবে দেখে গেলাম। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
— অামি খেয়ে এসেছি। ঘরে শুকনো খাবার থাকলে খেয়ে নিও।
— অামি তো রান্না করেছি।
— বাসায় তো বাজার করা ছিলো না।
— অামি বাজার করেছি।

ও বাজার করেছে শুনে অামি কিছু টা অবাক হয়ে বললাম,
— এ শহরে তুমি সম্পূর্ণ নতুন। বের না হলেও পারতে।
— বারে! অামি কি একা বের হয়েছি? পাশের বাসার একটা অান্টির সাথে গিয়েছি। ১ বিকেলেই অান্টিকে পটিয়ে নিয়েছি।

কথাটা বলেই কুহেলী মিটমিট করে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে রইলো অামার দিকে। এমন ভাব করছে, মনে হচ্ছে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ জয় করে এসেছে, তাই গর্বে বুক ফুলিয়ে এমন ভাব দেখাচ্ছে।

কিছুটা রাগ হলেও পরে ওর হাসি টা দেখে কেন জানি রাগ টা চলে গেলো। 
নাহ! মেয়েটার চেহারায় একটা নিষ্পাপ নিষ্পাপ ভাব অাছে। যার জন্য হয়তো অামার রাগ টা চলে গেছে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here