কুহেলিকা পর্ব-০২

0
578


পরদিন সকালে নাস্তা করতে বসে দেখি আমার প্রিয় পিঠা দুধ-চিতই রান্না করা হয়েছে। আমি কিছুটা খুশি হয়ে বললাম,
— বাহ! এটা আমার খুব প্রিয়।
— আমি জানি।
— কি করে?
— বিয়ের পর মা যখন এটা বানাতো তখন ই বলতো এটা আপনার নাকি অনেক প্রিয়। কিন্তু আপনি তো সব সময় এখানে থাকতেন। তাই জানতেন না মা কত ভালোবাসে আপনাকে। তখন অবশ্য একটু হিংসে হতো। মা কেন আমার বরের চেয়ে আপনাকে বেশি ভালোবাসবে এই ভেবে। এখন অবশ্য হয়না। এখন তো আপনিই আমার ..

এতটুকু বলেই কুহেলী হঠাৎ থেমে গেলে। আমি বুঝতে পেরে ওর দিকে তাকালাম। দেখলাম লজ্জা আর সংশয় মাখা একজোড়া চোখ আমার দিকে একটু চেয়ে সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে ফেললো।

ওর এমন সংশয় দেখে অামি ভাবলাম, অামাকে বর বলতে ওর সংশয় হচ্ছে কেন। 
অামাকে চুপ থাকতে দেখে অথবা কথাটা চাপিয়ে যেতেই সে এবার অন্য প্রসঙ্গে কথা বললো।

— চা খাবেন?
— অামি চা খাইনা।
— কেন? কালো হয়ে যাবেন বলে?
— এটা কেমন কথা? চা খেলে অাবার মানুষ কালো হয় নাকি। 
— নাহ! মজা করে বললাম। অাচ্ছা অাজ একটু খান। শীতের শেষ অার শীতের শুরু এই দু’টো সময়ে পরিবেশ টা অসম্ভব ভালো লাগে অার এমন সময়ে সকাল বেলা এক কাপ চা যেন সকাল কে পরিপূর্ণ করে। এমন টা অামার মনে হয়। অাচ্ছা অাপনার জন্যও অানি কেমন?

কথা টা বলেই কুহেলী কিচেনের দিকে ছুঁটে গেলো। অামার উত্তরের অপেক্ষাও করলো না অার। যেন, বড্ড জলদি তার। অামি খেয়াল করলাম পিছন দিকে মেয়েটার শাড়ির অাচল টা মেঝে ছুঁয়েছে। যেন সদ্য কোন বালিকা নতুন শাড়ি পরা শিখছে। অার না পরতে পারায় তার অগোছালো শাড়ি তার অবাধ্যে মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে।
অামি মনে মনে ভাবলাম, এত বড় মেয়ে এখনো শাড়ি পরতে পারেনা। হঠাৎ অামার মন অামায় প্রশ্ন করলো, অাচ্ছা মিতু কি শাড়ি পরতে পারে?

মিতু কে কখনো অামি শাড়ি পরতে দেখিনি। ভাবছি অাজ জিজ্ঞেস করবো ও শাড়ি পরতে পারে কিনা। অার সাথে একটা শাড়ি গিফটও করবো।

সেদিন ই মিতুর জন্য ১ টা পারপেল রঙের কাতান কিনলাম।
জীবনে প্রথমে কারো জন্য শাড়ি কিনেছি। মনে কেমন যেন অন্য রকম অানন্দ হচ্ছিলো। হয়তো মিতু কে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখবো বলে, অার অথবা অন্য কোনো না জানা কারনও হতে পারে।

বিকেলে মিতু কে এটা দিলাম। 
প্যাকিং টা খুলেই তার মুখ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। অামি ওর এমন চেহারা দেখে জিজ্ঞেস করলাম,

–পছন্দ হয়নি?
— তুমি জানো না অামি শাড়ি পরিনা যে? 
— কিন্তু কেন?
— শাড়িতে দেখতে গর্জিয়াস দেখায় না।
— কে বলেছে?
— কে কেন বলবে? অামি বলছি। ভেবেছি কোনো দামী কিছু এনেছো। কত অাশা নিয়ে প্যাকেট টা খুললাম। ধ্যাত!

কথাটা বলেই মিতু গম্ভীর হয়ে বসে রইলো।
অামি ওর কথায় কিছুটা কষ্ট পেলেও তা ওকে বুঝতে না দিয়ে কথার প্রসঙ্গ পাল্টালাম।

হঠাৎ মিতুর সোনালি বর্ণের চুলের দিকে তাকাতেই অামার চোখে নিজের অজান্তেই কুহেলীর কালো লম্বা চুল গুলো ভেসে উঠলো। হঠাৎ কেন যেন মনে হচ্ছিলো, সেনালির চেয়ে কালো চুল বেশি সুন্দর। 
অামি হঠাৎ মিতু কে বললাম,

— মিতু। তুমি চুল সোনালি রাখো কেন? কালো কেন রাখোনা। অামার মনে হচ্ছে তোমায় কালো চুলে বেশি ভালো লাগবে।

অামার কথায় মিতু একপ্রকার রেগেই গেলে। সে ভ্রু কুচকিয়ে অামায় বলতে লাগলো,

— দিনদিন তুমি এমন কেন হয়ে যাচ্ছো? অাগেও অামি এমন ছিলাম। তখন তো কিছু বলোনি। অার অামার চুলে কালার করতে ভালো লাগে। এ কালার টা একটা ফ্যাশন। অার এটাই অামি রাখবো। বুঝেছো?

কথাটা বলেই মিতু সেখান থেকে চলে গেলো। শাড়িটিও নিলোনা।
অাশ্চর্যের ব্যপার হলো অামি ওকে একবারের জন্যও থামাইনি, ওর রাগ ভাঙাতেও চাইনি।

হঠাৎ অামার কেন এমন টা হলো অামি ভাবতে লাগলাম। অাগে তো সব সময় ও রাগ করলে এমন চুপ করে বসে থাকতাম না। কিন্তু অাজকের এই চুপ থাকার কারন নিয়ে অামার মন কিছুটা ভাবাচ্ছিলো অামায়।

পরক্ষনেই মনে হলো, হয়তো ও অামার গিফট রিজেক্ট করেছে বলে এমন হয়েছে।

প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে শেষ বিকেলে বাসায় ফিরলাম।
খাঁটের উপর প্যাকেট টা রেখেই ফ্রেশ হতে চলে গেলাম। 
ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই সোজা বারান্দায় চলে গেলাম।
কিন্তু বারান্দায় গিয়েই অামি চমকে গেলাম কুহেলীকে দেখে। মিতুর জন্য কিনা শাড়িটি তার গায়ে। ওর গায়ে শাড়ি টা দেখে যখন ই অামি রেগে কিছু বলতে গেলাম, তখন ই কুহেলী অামায় বললো,
— ধন্যবাদ এত সুন্দর উপহারের জন্য। শাড়িটা অামার অনেক পছন্দ হয়েছে।

অামি দেখলাম কুহেলী অাজ হালকা সেজেছে। ওর কাজল মাখা চোখ গুলো অাজ টানা টানা দেখাচ্ছিলো। মনে হচ্ছে কাজল তার চোখে সাজতে পেরে যেন পরিপূর্ণ রুপ পেয়েছে। এর অাগে অামি কখনো কুহেলী কে কাজল পরতে দেখিনি। হঠাৎ অামার মন অামায় প্রশ্ন করলো, কাজলে যার চোখ এত মায়াবি দেখায় সে এতদিন কাজল পরেনি কেন!! 
কিন্তু অদ্ভুত ব্যপার হলো মন এর কোনো উত্তর দিলোনা। 
অামাদের মন গুলো অদ্ভুত হয়। প্রশ্ন করে, কিন্তু হাজার চেয়েও উত্তর মিলেনা তার কাছে।

অামি যখন এসব ভাবছিলাম অামার ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে হঠাৎ কুহেলী অামায় প্রশ্ন করলো,
— এর অাগে কখনো কারো জন্য শাড়ি কিনেছেন?
— নাহ।
— তারপরও এত ভালো চয়েস করতে পারলেন!! বাহ!

কথাটা বলেই কুহেলী অাকাশের দিকে ফিরে কি যেন দেখায় মগ্ন হয়ে পড়লো।
অামি এবার ওর অজান্তেই ওকে অারো ভালো করে দেখে নিলাম। অনেক সুন্দর করে শাড়ি পরেছে অাজ মেয়েটা। কিন্তু এই তো সকালেও যার শাড়ি মাটিতে লুটোপুটি খেলো, সে বিকেলের মাঝে কিভাবে এত সুন্দর করে শাড়ি পরা শিখে নিলো।
মনে কিছুটা প্রশ্ন জাগলেও মন এবারো কোনো উত্তর দিলোনা।

মন উত্তর না দেয়ায় অামি কুহেলীকে অারেকবার ভালো করে দেখার নেশায় তাকালাম। গোধূলির লাল অাভা ওর মুখে এসে পড়েছে। ওর হলদে বর্ণের সাথে গোধূলির লাল অাভার অদ্ভুত রকমের মিতালি ঘটেছে।
এ জন্যই হয়তো ওর মাঝে অদ্ভুত সৌন্দর্য ফুটে উঠছে।

কেন যেন ওকে এই মুহুর্তে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিলো।

মন দেখতে চাচ্ছিলো অার অামার বাইরের অামি বারবার না করছিলো।

মন অার অামার এমন দোটানা কথায় মন এবার সায় দিয়ে বললো, দেখতে তো অার গুনাহ নেই। শত হোক, বিয়ে করেছি তাকে।

পাশের মসজিদ থেকে অাযান শুনা গেলো। হঠাৎ ও তাড়াহুড়া করে মাথায় অাচল টানলো।
ওর নড়ে উঠা দেখে অামি বাস্তবে ফিরে এলাম।
মনে করতে চেষ্টা করলাম ঠিক কত সময় পর্যন্ত অামি ওকে দেখছি।

চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here