কুহেলীকা পর্ব-০৩

0
482

শেষ রাতে হঠাৎ পানির পিপাসায় ঘুম ভেঙে যায়। 
পানি খেতে গিয়ে দেখি বারান্দার দরজা গলে জোছনা ঢুকছে ঘরে। 
এর অাগে কখনো অামি অন্ধকার কামরা জোছনায় ভরে থাকতে দেখিনি। যখন ই দরজার কিছুটা কাছে গেলাম, শুনলাম কুহেলী গুনগুন করে গান করছিলো, 
” অামি রজনীগন্ধা ফুলের মত গন্ধ ছড়িয়ে যাই, অামি মেঘে ঢাকা চাঁদের মত জোছনা ছড়িয়ে যাই, ….. “

কেন যেন ওর গাওয়া গান টা তখন ভালো লাগছিলো। অামি চুপচাপ দাড়িয়ে ওর গাওয়া গান শুনছিলাম। গানের সাথে অদ্ভুত নিশ্চুপ রাতের কেমন যেন মিল পাচ্ছিলাম। রাত অার গান দু’টোই খুব করুণ ছিলো। 
দু’টো তেই যেন কারো করুন কষ্টের বর্ণনা পাচ্ছিলাম।

হঠাৎ ওর গান থামিয়ে দেয়াতে অামি ওর দিকে তাকালাম। দেখলাম ও অবাক হয়ে অামার দিকে চেয়ে অাছে।
ওর চেয়ে থাকা দেখে অামি কিছুটা বিভ্রান্তিতে পড়লেও পরক্ষনে তা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— এত রাতে একা ভয় করেনা?

ও খানিকটা হেসে জবাব দিলো,
— যার মন কষ্টে ঘিরে যায়, সে কখনো কষ্ট ছাড়া অার কিছু কে ভয় পায়না।

অামি ওর মুখে এমন কঠিন কথা শুনে এবার ভালো করে ওর দিকে চেয়ে দেখলাম।

দেখলাম ওর চোখের নিচে কি যেন চিকচিক করছে। চাঁদের অালোয় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, তা চোখের জল। 
কিন্তু অামার কাছে কিছুটা অবাক লাগলো। চোখে জল নিয়ে মুখে কেউ হাসি ফুটায় কি করে!!

কিছুক্ষণের নিরবতা ভেঙে হঠাৎ ও বলে উঠলো,
— অাপনার ভাই সব সময় বলতো, ভরা পূর্ণিমাতে ও অামায় দীঘির জলে চাঁদের স্নান দেখাতে নিয়ে যাবে। কিন্তু কখনো তা হয়নি। 
— কেন?
— কারন, পূর্ণিমা যে বড্ড দেরি করে এলো । অাজ পূর্ণিমার চাঁদ অাছে, কিন্তু ও নেই।
— মিস করো ভাইয়াকে?
— মানুষ যখন একা থাকে, তখন সে তার সুখময় অতীতকে বেশি মিস করে। অার গভীর রাত মানুষ কে একাকিত্বে ভরে দেয়। এসব অাপনি বুঝবেন না। অনেক রাত হয়েছে অাসি।

কথাটা বলেই কুহেলী চলে গেলো। অামি খেয়াল করলাম ওর এমন কথা শুনে অামার কিছু টা খারাপ লাগলো। কিন্তু কেন লাগলো তা বুঝলাম না। হয়তো ও ভাইয়া কে মিস করছে বলে অার নয়তো ভাইয়া অার অামাদের মাঝে নেই বলে।
দু’টোর যে কোনটাই হতে পারে। অথবা একটাও নয়।
অামি কখনো নিজের মন বে বুঝে উঠতে পারিনা। সব সময় দ্বিধায় ভুগি। এখনো তেমন হলো।

কিছুক্ষন পর, খারাপ লাগার কারন খোজা বাদ দিয়ে অামি এবার চাঁদটার দিকে তাকালাম। চাঁদ টা অনেক বড় দেখাচ্ছে। মনে হয় অাজ ভরা পূর্ণিমা। 
শুনেছি পূর্ণিমা চাঁদ নাকি মনে প্রেম জাগায়। কিন্তু অামার মনে এ মুহুর্তে এক করুণ কষ্ট জাগলো। এ কষ্টের কারন, হয়তো কুহেলীর কথা গুলো হতে পারে। অথবা, এ ভরা পূর্ণিমায় মিতু অামার পাশে নেই বলেও হতে পারে।।

সে রাতে অার ঠিক করে ঘুম হয়নি। একটু ঘুম এলেই অদ্ভুত হিজিবিজি কিসব স্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায় বারবার।

পরদিন সকালে কাজ সেরে মিতুর সাথে দেখা করতে চলে গেলাম। বের হওয়ার সময় কুহেলী বললো, দুপুরে বাসায় খেতে। ওর এমন কথায় অামি কিছুটা বিরক্তিবোধ প্রকাশ করে বলেছিলাম, অধিকার না দেখাতে। অামার কথা শুনে ওর কেমন লেগেছে তখন অামি তা নিয়ে একবারো ভাবিনি। কারন অামার মাথায় তখন মিতুর কথা ঘুরছিলো। না জানি কালকে রাগ না ভাঙার জন্য কতটা অভিমান করে অাছে।

বেলা ১১ টা।
দীর্ঘ ১৫/২০ মিনিট বসে থাকার পর মিতুর অাগমন ঘটে। 
ওকে দেখে কিছুটা ভয় হতে লাগলো। কালকে ওর রাগ ভাঙাই নি বলে। 
অাসার পর কিছুক্ষণ দু’জন চুপ করে বসে রইলাম। 
অামি যখন ভাবছিলাম কি বলবো, তখনই সেখানকার নিরবতা ভেঙে মিতু অামায় বললো,
— তুমি তো জানোই অামি সংসারের এক মাত্র সন্তান। অামার পছন্দ -অপছন্দ নিয়ে কখনো মা বাবা কিছু বলেনি। তাই হয়তো কাল তুমি বলায় অামি রেগে যাই। এসব অামি কখনো ফেইস করিনি তাই হয়তো এমন হয়েছে।

ওর এমন কথা শুনে অামার ভয়টা কেটে যায়। মনে মনে অনেক ভালো লাগে। মেয়েটা অাসলেই ভালো। 
অামি কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম,
— তুমি যে অামায় বুঝেছে এতেই অামি অনেক খুশি হয়েছি। ধন্যবাদ মিতু। 
— কিন্তু অামি রেগে অাছি এখনো। তুমি চাইলেই কাল ফোন করে সব কিছুর সমাধান করতে পারতে। কিন্তু তা করোনি।

ওর এমন কথায় এবার অামি কিছুটা ঘাবড়ে যাই। অামি অাসলেই কাল ফোন করে সব কিছুর সমাধান করতে পারতাম। কিন্তু অামি তা করিনি। বরং, কুহেলীর সাথে সময় কাটিয়েছি। হঠাৎ করে অাবারো নিজেকে অপরাধি মনে হতে লাগলো।
অামার মনে হলো মিতু কে সব বলা উচিত। 
অামি যখন এসব ভাবছিলাম, তখন হঠাৎ অামার ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে মিতু বলে উঠলো, 
— অারেহ কি ভাবছো?? এখন তো সরি বলো। অদ্ভুত!
— অাচ্ছা অকে সরি।

অামার মুখে সরি শুনে মিতু অনেক খুশি হয়ে অামার এক হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখলো।
ওর রাগ বা অভিমান কোনোটাই নেই দেখে অামি অনেকটা খুশি হই।

সেই মুহুর্তে অামার মনে হলো, “নাহ! অামি মিতুকেই ভালোবাসি। কুহেলীকে তো না। ভালো ব্যবহার করেছি ওর সাথে তার মানে তো এই না যে, অামি তার প্রেমে পড়ে যাবো।

প্রতিদিনের মত অামরা সেদিনও মিতুর প্রিয় রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ টা করতে গেলাম। অদ্ভুত ব্যপার হলেও সত্যি যে, অামার মনে তখন বারবার কুহেলীর সকালের অনুরোধ টাই ঘুরছিলো। 
অামি যতই মন থেকে তা দূর করতে চাচ্ছিলাম ততই যেন মনে বারবার তা ঘুরছিলো। 
অামার এমন নিরবতা দেখে মিতু হঠাৎ বলে উঠলো,
— একটা বিষয় খেয়াল করেছো দিগন্ত? 
— কি?
— অামরা দু’জন ই কথা কম বলি। প্রায় রিলেশানে দেখি একজন ইন্ট্রোভার্ট হয়, অার অন্যজন এক্সট্রোভার্ট। কিন্তু অামাদের ক্ষেত্রে উল্টো। 
— হুম। অামাদের সব কিছুই কেমন যেন! 
— সব কিছু বলতে?
— এই যে অামি অাজ তোমার দেয়া শার্ট পরে এসেছি কিন্তু তুমি নটিশ ই করলা না।

অামার কথাটা শুনে মিতু তখন হঠাৎ করে কিছুটা অবাক হয়ে অামার দিকে তাকিয়ে বললো,
— ওহ হো। তাই তো। অামি তো খেয়াল ই করিনি। 
— তা কেন করবে।

অামার এমন কথা শুনে মিতু চুপ হয়ে গেলো। ও একবারের জন্যও বুঝলো না অামার কিছুটা অভিমান জন্ম হয়েছে তার উপর।
সে সরি বলবে এই ভেবে কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থেকে পরে খাওয়া শুরু করে দিলাম।

দু’জন ই চুপচাপ খাচ্ছিলাম। বাইরে সবকিছু হঠাৎ করে অন্ধকার হয়ে পড়ছিলো মনে হয় মেঘ করছে। যেকোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। অামার অভিমানগুলোও ঠিক এমন। মাঝে মাঝে তারা মনের মাঝে মেঘ জমায়।
কিন্তু অাকাশের সাথে অামার একটাই পার্থক্য।
সে মেঘ জমিয়ে কাঁদতে পারে। কিন্তু অামি তা পারিনা।
ছেলেদের কাঁদতে নেই। তাদের দুর্বলতা অন্যকে দেখাতে নেই। কারন তারা পুরুষ। এ বিষয়ে তাদের ধর্মই কঠোরতা।

চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here