কুহেলিকা পর্ব-০৪

0
395

এক অাকাশ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দুপুরে বাসায় ফিরে দেখি ঘরে তালা ঝুলছে।
কিছুটা অবাক হলেও ভয় হলো অনেক টুকু। 
হঠাৎ করে কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। কুহেলী কোথায় গেলো! 
প্রথমত, অচেনা শহর, দ্বিতীয়ত, এখানে ও কাউকে চিনেনা। 
হঠাৎ করে বুকের ভিতরে কেমন যেন করে উঠলো। এক দৌড়ে নিচে গিয়ে দারোয়ান কে জিজ্ঞেস করলাম কুহেলীকে কোথাও যেতে দেখেছে কিনা। দারোয়ানের না জবাব শুনে অামার ভয়টা দ্বিগুন বেড়ে গেলো। সবার প্রথমে যে চিন্তাটা মাথায় এলো তা হলো, বাবা কে কি বলবো!
হুট করে মাথায় প্রশ্ন জাগলো, ও চলে গেলো না তো। অামার কাছে থাকা এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলেই ওর রুমে গিয়ে দেখি ওর সব জিনিসপত্র বাসাতেই।

কোথায় খুজবো, কার বাসায় খুজবো, একা কিভাবে খুজবো, যখন ই এসব প্রশ্ন মাথাতে ঘুরপ্যাঁচ খাচ্ছিলো তখন ই ডোরবেলের শব্দে অামার ভাবনায় ছেদ পড়ে। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখি কাক ভেজা হয়ে দাড়িয়ে অাছে কুহেলী। 
ওকে দেখে তখন কেন যেন অামার এত রাগ হয়েছে যে, রাগের বসে ঠ্যাশ করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিই।

অামার থাপ্পড়ের কোনো নালিশ না করেই ও ভীত কণ্ঠে জবাব দিলো,
— অাপনার কাপড়। ছাদে।

এতটুকু বলেই ও থেমে গেলো। ওর হাতে অামার কাপড় দেখে মনে পড়লো সকালে অামি অামার ভেজা কাপড়গুলো ছাদে শুকোতে দিয়ে যাই।

কিছু না বুঝেই থাপ্পড় দেয়ার জন্য যখন কিছুটা অপরাধবোধ থেকে সরি বলতে যাচ্ছিলাম তখন ই দেখি ও সরির অপেক্ষা না করে চলে গেলো।
ওর হঠাৎ চলে যাওয়া দেখে অামার মনে হলো, হয়তো সরি শুনার অব্যাস নেই তার।

বৃষ্টিগুলো অদ্ভুত ভাবে ঝরে যাচ্ছে। যেন তার প্রিয়জনের উপর হাজার বছর ধরে জমানো অভিমান ঝরাচ্ছে সে।
অামার সেদিকে মাথা ব্যাথা নেই। অামার মাথা ব্যাথা সব কুহেলীকে নিয়ে। ওর নরমাল অাচরন দেখে। 
বীনা কারনে থাপ্পড় খেয়ে কেউ কি করে নরমাল অাচরন করতে পারে!
না রাগ, না অভিমান, অার নাই বা কোনো অভিযোগ।
সেই দুপুরের পর থেকেই ওর এমন নরমাল অাচরন দেখছি। ওর এমন অাচরনে কেন যেন অামার মেজাজ খারাপ হতে লাগলো। মন চাইলো অাবারো কসিয়ে এক থাপ্পড় মেরে বলি, অামার অপরাধের কোনো অভিযোগ নেই তোমার?
কিন্তু পুনরায় একই ভুল করতে পারিনা বলেই হয়তো এমন টা করিনি।
অামি যখন ওর উপরে জমা রাগ কে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছিলাম তখন ই অামার রাগদের দ্বিগুন বাড়িয়ে ও অামায় বললো,
— চা খাবেন? 
ওর এমন স্বাভাবিক কথাবার্তা শুনে অামি কিছুটা রাগি কণ্ঠেই জবাব দিলাম,
— তুমি কি সারাদিন চা খাও? যখন তখন শুধু চা চা করো। অদ্ভুত! অার তোমার কি মনে একটুও রাগ নেই? ক্ষোভ নেই? বীনা কারনে থাপ্পড় খেলে তার জন্য সরিও শুনতে ইচ্ছে জাগেনা তোমার?
— বৃষ্টির বিকেলে চা’য়ে অন্য রকম মজা অাছে। অাপনি বুঝবেন না।

এই বলে ও কিচেনের দিকে চলে গেলো। অামি অবাক হলাম এই ভেবে, ও অামার পরের প্রশ্নের কোনো উত্তর ই দিলো না।
ওর এমনটায় অামার রাগ তো বাড়লোই। সাথে কিছুটা কষ্টও হলো। কষ্ট কেন হলো জানি না।

কিছু সময় ওর এমন অাচরন নিয়ে ভাবার পর অামার মনে প্রশ্ন জাগলো, ওর এমন অাচরনে অামি কেয়ার ই বা করছি কেন এত! 
এসব নিয়ে অার ভাবাই উচিত নয় বলে মনে হলো অামার।
যখন ই অামি মন কে বুঝালাম এসবে কেয়ার করা উচিত নয়, তখন ই কুহেলী অামার সামনে চা’য়ের কাপ রেখে বললো,
— কিছু কিছু কষ্ট ভালো লাগার হয়। থাপ্পড়ে কিছুটা ব্যাথা পেলেও সে থাপ্পড়ে অামার প্রতি অাপনার কেয়ারিং মনোভাব ফুটে উঠেছে। তাই অভিমান বা অভিযোগ কোনোটাই নেই।

ওর মনে অামার জন্য পজেটিভ ধারণা দেখে কিছুটা ভালো লাগলেও, হুট করে মনে হলো ওর মনে পজেটিভ ধরণা না জন্মানোই ভালো। কারন, অামি চাই না ডিভোর্সের পর ওর কোনো কষ্ট হোক। ওর পজেটিভ ধারণা বদলাতেই অামি ওকে বললাম,
— এটা তোমার প্রতি কেয়ারিং না। এটা বাবাকে জবাবদিহিতার ভয়। তুমি চলে গেলে অামি বাঁচতাম। কিন্তু বাবাকে কি বলতাম!

কথাটা বলেই অামি ওর দিকে তাকালাম। অামি ভেবেছিলাম, অামার এমন কথায় ও কষ্ট পাবে। কিন্তু কষ্টের বদলে ওর মুখে হাসি দেখা গেলো। এক ফালি মুচকি হেসে ও সেখান থেকে চলে গেলে।

ও চলে যাওয়ার পর অামি ওর হাসির পিছনের কারন খুজতে লাগলাম। কিন্তু খুজে পেলাম না।

ওর দিয়ে যাওয়া চা’য়ের কাপ থেকে এখনো ধোঁয়া উঠছে। হাতে নিয়ে এক চুমুক মুখে দিলাম। নাহ! চা টা ভালোই লাগছে। 
এর অাগে কখনও চা’য়ের অভ্যেস হয়নি। কারন বাসায় একা থাকতাম বলে অালসেমির জন্য করে খেতাম না। আজকাল কুহেলী করে দেয় বলে খাওয়া হয়।

অাজকাল সন্ধ্যের পর কিছুটা শীত শীত করে। কিন্তু অাজ একটু বেশিই। এবার মনে হয় শীত টা পড়বেই। মা বলতো, নভেম্বরের বৃষ্টি নাকি সাথে শীত নিয়ে অাসে। শীতের কথা মনে পড়তেই মনে হলো কুহেলীর কথা। ওর শীতের কাপড়-চোপড় সাথে এনেছে তো। ভাবলাম গিয়ে জিজ্ঞেস করে অাসি।

ওর দরজায় ২/১ বার নক করার পর কোনো শব্দ না পেয়ে নিজেও ঢুকে পড়লাম। 
দেখি গুটিসুটি মেরে শুয়ে অাছে। জেগে অাছে ভেবে ১ বার ডাকলাম। দেখলাম ঘুমোচ্ছে।
ঘুমোচ্ছো দেখে যখন চলে যাবো ভাবলাম তখন ই মনে প্রশ্ন জাগলো ,, এত তাড়াতাড়ি ঘুমাচ্ছে কেন।

অামি যখন এটা ভাবছিলাম তখন ও হঠাৎ নড়ে উঠলো। যেন মনের কথা শুনেই তার জেগে উঠা। ওকে নড়তে দেখে অামি বললাম,
— এত তাড়াতাড়ি ঘুমাচ্ছো?
— কিছুটা জ্বর জ্বর করছে।
— কেন? এত সাহসী মেয়ের এত অল্প ভিজতেই জ্বর এলো!

অামার কথায় ও কিছুটা হেসে চোখ বন্ধ করে বললো,

— ঘরে জ্বরের ঔষুধ অাছে?
— দেখতে হবে।

এ কথা বলেই অামি চলে গেলাম জ্বরের ঔষুধ খুজতে। কিছু সময় খোজার পর পেয়েও গেলাম। এক গ্লাস পানি অার সাথে ১ টা ট্যাবলেট নিয়ে ওর রুমে এসে দেখি ও অাবারো ঘুমোচ্ছো।
দু’ একবার ডাকার পর উঠে বসলো। নিজ হাতেই খেয়ে অাবার শুয়ে পড়লো।

অামি কিছুক্ষণ ওর দিকে চেয়ে রইলাম। ঘুমন্ত কুহেলীকে অন্যরকম সুন্দর দেখাচ্ছে। অামি চুপচাপ চেয়ে রইলাম। অদ্ভুত হলেও সত্যি যে অামার খুব ইচ্ছে করছিলো ওর কপালে হাত দিয়ে ওর জ্বর টা পরিমাপ করতে। 
ইচ্ছে করলেও কিছুটা দ্বিধায় ভুগছিলো মন। শেষে ইচ্ছেকেই বাস্তবায়িত করলাম। ওর পাশে বসে ওর কপালে হাত রাখলাম।
হাত রাখার সাথে সাথেই ও চোখ খুলে ফেললো। অামি কিছুটা ভয় পেয়ে হাত সরিয়ে ফেললাম। 
ও তখন বিটবিট করে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো,
— অামার খুব ভয় হচ্ছে। মনে হচ্ছে এ রাত শেষ হবে না। সকাল হবেনা। অার অামি অসুস্থের এ কঠিন রাতে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যাবো।

ওর মুখে অামি এমন অদ্ভুত কথা শুনে অাবার ওর মাথায় হাত রেখে বললাম,
— কি বলছো এসব? কেন এমন হবে? এটা সামান্য টুকু জ্বর। তোমার কিছু হবে না। ভয়ের কিছু নেই। অামি অাছি তো। 
— জানেন তো? অসুস্থের রাত গুলো দীর্ঘ হয়। অামি সকালে বাড়ি যাবো। অামাকে বাড়ি নিবেন তো?

ওর কথা গুলো শুনে অামার ওর প্রতি কেমন যেন একটা মায়া হলো। অামি ওর পাশেই বসে রইলাম। যদি ওর ভয় গুলো একটু হলেও কাটে, এই ভেবে।
ভালো না বাসলেও কিছুটা দায়িত্ববোধ অার মানবতার খাতীর তো দেখানো যায়।

অামি খেয়াল করলাম ও অনেক নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছো। অাগের মত গুটি সুটি মেরে। হাত দু’টো মাথার নিচে। ঘুমের মাঝে ওকে দেখতে বয়স অনেক টা কম দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন ষোড়শী কোনো কিশোরী। 
ওকে দেখে অনেক টা মায়া হলো। মনে হলো অামার সাথে বিয়ে না হলে অনেক ভালো হতো। অন্যকারো সাথে হলে ও অনেক সুখি হতো।

নানা কথা ভাবতে ভাবতে রাত কখন ঘুম এসেছিলো খেয়াল ই করিনি । মধ্যরাতে হঠাৎ টের পেলাম একটা উষ্ণ শরীর অামাকে জড়িয়ে অাছে। অামি কিছুটা বাস্তবে ফিরে অাসলাম। বুঝলাম এটা কুহেলী। ওর মাথাটা অামার কাঁধের খুব কাছে। একটা মিস্টি ঘ্রাণ অাসছিলো ওর চুল থেকে। মনে হয় শ্যাম্পু করেছে। এক অদ্ভুত জাল যেন অামায় সেখানে অাঁটকে রাখলো। ওকে সরিয়ে উঠে অাসার শক্তি সে মুহুর্তে অামার ছিলোনা। অামি শক্ত করে ওকে ধরলাম। এবার ও কিছুটা নড়ে উঠলো, কিন্তু সরে গেলোনা।

এক অদ্ভুত ভালো লাগায় মেতে উঠলাম অামি। অামার ভিতরের অামি না করলেও বাহিরের অামি এর মতে গিয়ে হলেও অামি ওকে কাছে টেনে নিলাম।

বাইরে মাঝে মাঝে অালোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে অাবার বৃষ্টি নামবে। রাতের বৃষ্টিরা অদ্ভুত হয়। তারা প্রকৃতির সাথে সাথে মনুষ্যমনেও নেমে পড়ে মাঝে মাঝে।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here