কুহেলিকা পর্ব-০৫

0
487

রাতটা কেটেছে ঘোরের মাঝে। বাস্তবতা তখন সামনে অাসেনি। ভাবিনি এরপর কি হবে। শুধু অাকর্ষন অার মোহে কেটেছে সব।
যা সকালে বুঝতে পারি। প্রচন্ড অপরাধবোধ হচ্ছিলো। নিজের মনের সাথে হাজার টা যুদ্ধ করে যাচ্ছিলাম।

মানুষের মন গুলো অনেক অদ্ভুত! মনে যদি প্রশান্তি না থাকে তাহলে সে কখনো সুখি হতে পারে না। শরীরে অসুখ ধরলে তা কষ্ট দেয় ঠিক, কিন্তু মনের অসুখ মানুষ কে একটু একটু করে কষ্ট দিয়ে শেষ করে ফেলে।

অামি ভাবছিলাম অামি কি করবো। সরি বলবো নাকি অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে তাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিবো। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হলো, অপরাধবোধে যদি এখন মেনে নিই পরে না অামি সুখি হবো অার না ই বা সে সুখি হবে।

হাজার চিন্তারা যখন মনের মাঝে অদ্ভুত ধরনের কষ্ট দিয়ে যাচ্ছিলো, তখনই কুহেলী এসে চা দিয়ে চলে যাচ্ছিলো। এটা দেখে অামার হঠাৎ করে এতটাই রাগ হলো, কাপ টা হাত দিয়ে সরিয়ে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে বললাম,
— অধিকার দেখাতে অাসছো? কি ভেবেছো তুমি? সব মেনে নিবো?
— অধিকার নয়। কর্তব্য। কর্তব্যের খাতীরে করছি। অার হ্যাঁ, রাতে বলেছেন না বাড়ি নিয়ে যাবেন? কখন নিয়ে যাবেন? রেড়ি হচ্ছি অামি।

কথা টা বলেই ও চলে গেলো। অামি কিছুটা অবাক হই। ওর এত নরমাল অাচরনে। পরক্ষনেই ভয় বেড়ে গেলে মনে। বাড়ি গিয়ে ও বাবাকে নালিশ দিবে না তো। সাত-পাঁচ কথা মনের মাঝে ঘুরপ্যাঁচ করলেও অামি রেড়ি হতে চলে গেলাম।
যতই হোক কথা দিয়েছি। তা তো রাখতেই হবে। 
মনকে বুঝালাম। বাবা কে বলে দিলে বলে দিবে তাতে অামার সমস্যার তাড়াতাড়ি সমাধান হবে।

দুপুর ১২ টায় স্টেশান এসে হাজির হই। রেইলস্টেশান গুলোতে সবসময় নানা ধরণের মানুষে গিজগিজ করে সব সময় ।। লোকারণ্য ভরপুর জায়গা গুলো অামার প্রচন্ড বিরক্তিকর লাগে। অার সব চেয়ে বড় বিরক্তিরকর ব্যপার হলো ট্রেইন লেইট করে ছাড়ে। তার মাঝে কোনো পানচুয়্যালিটি নেই। এ জন্য অামার ট্রেইন জার্নি কখনোই পছন্দের ছিলোনা। কিন্তু কুহেলীর অনুরোধেই ট্রেইন জার্নি। 
শেষবারের জন্য মানবতাবোধের খাতীরে হয়তো তার অনুরোধ কে না করিনি।

টানা অাধা ঘন্টা পর ট্রেন ছাড়ে। রাগ, বিরক্ত সব কিছুই বরাবর বেশি ছিলো। কথা বলার মত কোনো মোড ছিলোনা। পাছে কুহেলী যেন কথা না বলে সে জন্য ঘুমোনোর চেষ্টা করলাম। ঘুম অাসছিলোনা তবুও চোখ বন্ধ করে ছিলাম। 
ঘুম না এলে চোখ বন্ধ করে থাকলে কেমন যেন লাগে। মন ভাবে বারবার যে, অাশে পাশের মানুষ গুলো কেমন করে তাকাচ্ছে। 
অামার এ মুহুর্তে অাশেপাশের মানুষ নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। আমার মাথা ব্যাথা কুহেলী নিয়ে। অামার কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে ও অামার দিকে তাকিয়ে অাছে। অাবার মনে হলো এই বুঝি ও ধাক্কা দিয়ে অামায় বলবে, এই এই ঘুমোচ্ছেন।

কিন্তু নাহ! তেমন কিছুই হলো না। নানা ভাবনার মাঝে কখন সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে গেছি বলতেই পারিনি।
যখন জেগেছি তখন প্রায় বিকেল ৪ টা। 
তাকিয়ে দেখি কুহেলী চিপস খাচ্ছে। খুব অবাক হলাম এই ভেবে যে, এত সময় পর্যন্ত ঘুমালাম কিন্তু একবারো টের পেলাম না কি করে। 
অামাকে জেগে উঠতে দেখেই ও বললো,
— দুপুরের পর কিছু খাইনি। খীদে পেয়েছে তাই। অাপনি খাবেন?

অামি ওর এমন প্রশ্ন শুনে ওর দিকে কয়েক সেকেন্ড ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। অার ভাবলাম, ও সব কিছুকে এত স্বাভাবিক ভাবে কিভাবে নেয়। ওর দিকে তাকিয়ে এখন অার রাগ হচ্ছেনা। মায়া হচ্ছে অাবারো।

অামার উত্তরের অাশা না করেই ও ওর মত করে চিপস খেয়ে যাচ্ছে। ওর খাওয়ার ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে চিপস ওর খুব প্রিয় খাবার।
একজন প্রাপ্ত বয়সী মেয়ের চিপস কি করে এত প্রিয় হতে পারে অামার মাথায় এলোনা।

তখন ই এসব ভাবনা থেকে মুক্ত করতে যেন মিতু কল দিলো। ওর কল পেয়েই অামি চমকে উঠি। সাথে কিছুটা ভয়ও। অাজকাল ঠিক মত ওর খবরও নেয়া হয়না। না জানি কতটা রাগের পাহাড় জমিয়ে তা ছাড়তে কল দিলো। 
অামি সীট থেকে উঠে দূরে গিয়ে ওর কল রিসিভ করলাম। অামি হ্যালো বলার অাগেই ও চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
— ফোন ধরতে এতক্ষণ লাগে? কি করছিলে? অাজ এখন ই তোমাকে অামার সাথে দেখা করতে হবে। জলদি অাসো।
— অাসলে অামি একটু বাড়ি যাচ্ছি। দরকারি কাজ ছিলো।
— বাহ! বলোনি তো। অাজ কাল কিছুই বলোনা। যাও, যেখানে খুশি যাও।

এতটুকু বলেই ফোন রেখে দিলো। কিছুটা খারাপ লাগলো ওর জন্য। কিন্তু তা নিয়ে বেশি ভাবলাম না।

সীটে বসার সাথে সাথেই কুহেলী বললো,
— দীগন্তে কুয়াশা জমেছে দেখেছেন?

অামি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি দূরে পাহাড়ের কাছে কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। পাহাড় দেখে বুঝলাম সীতাকুন্ড এসে গেছি। লাল সূর্যটা ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছিলো না। কুয়াশার জন্য। শীত অাসছে বলে অাজকাল সকাল বিকেল নিয়ম করে কুয়াশা ঝরে। 
হঠাৎ কুহেলী অাবার বলে উঠলো,
— কুয়াশার অারেক নাম কি জানেন?
— নাহ।
— কুহেলী।

ওর কথা শুনে অামি চমকে গেলাম। ও কি বুঝালো! দীগন্তে কুয়াশা মানে! কুহেলী অার দীগন্তে অনেক মিল এমন কিছু। কিছুটা চুপ থেকে অামি জবাব দিলাম,
— কুয়াশা বেশিক্ষণ কখনো থাকেনা। রোদ এলেই হারিয়ে যায় সে।
— কিন্তু অামি হারাই না। অামার কাছ থেকে সবাই হারিয়ে যায়। 
কথাটা বলেই ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অাবারো বললো,
— যাক গে সে কথা।

এবার অামি অাবার ওর দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। বুঝতে চাইলাম ওর মনের ভাষা। ও সব সময় এমন অদ্ভুত করে কথা বলে কেন! অন্যকেউ হলে এমন নিরবে সব মেনে নিতো না। কিন্তু ও! এমন কেন! অামি ভাবছিলাম অার ওকে দেখছিলাম। 
অাজ ও মেরুন ১ টা শাড়ি পরেছে। টিপও পরেছে দেখছি। ভালোই দেখাচ্ছে।

কিন্তু অামার মনে হুট করে প্রশ্ন জাগলো, মেয়েরা তো কষ্টে থাকলে সাজেনা। ও কেন সাজলো! নাকি কষ্ট পেলে ও অারো বেশি সাজে।
নাহ! হতে পারে ওর কোনো কষ্টই নেই। 
ওর কষ্ট অাছে কি নেই এ দোটানায় থেকে অামি অাবার ওর দিকে তাকালাম। দেখলাম ও জানলায় মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। 
শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদ গুলো ওর চুলে পড়েছে। ওর চুলের বর্ণ টা কিছুটা মেরুন লাগছে। 
অার সে হালকা রোদগুলো ওর মুখে এক অালো অাধারি ভাব অানলো। অামি দেখলাম ওকে অাবারো অাজ অদ্ভুত রকমের সুন্দর দেখাচ্ছে।
ঠিক সেইদিন বিকেলের মত। 
অামার মনে হঠাৎ প্রশ্ন জাগলো, ওকে কি শুধু শেষ বিকেলেই এত সুন্দর দেখায়!

মনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর অাবার মন ই দিলো।
সে বলে উঠলো, 
— দীগন্ত। তুই কখনো তাকে ভালো করে দেখিসই নি।
দেখলে তোর মনে এমন প্রশ্ন জাগতো না।

মানুষের মন গুলো এমন কেন। তারা বাহিরের মানুষের চেয়ে অালাদা হয়ে যায় কেন মাঝে মাঝে। মনে হয় তাদের বাস যেন মনুষ্যদেহের বাহিরেই। মনুষ্য শরীরে বাস করেই সে মানুষের সাথে প্রতারনা করে যায়।

অদ্ভুত মন কে বুঝতে না পেরে অামি অাবার কুহেলীকাকে দেখতে লাগলাম। দেখতে তো মানা নেই। যতই হোক অধিকার যে অাছে। কেন যেন ওকে দেখলে মাঝে মাঝে মনে প্রশান্তি মিলে। অার মনের প্রশান্তির খাতীরে অামি অপলক দেখে যাচ্ছি তাকে।

ট্রেন টা হুইসেল বাজাচ্ছে কর্কট স্বরে। যেন চিৎকার করে কাঁদছে সে। দূরে পাহাড়দের পিছনে সূর্যটা লুকোতে শুরু করছে। ঠিক যেন কোনো লজ্জাবতী নারী লজ্জায় ঘুমটো টানছে মুখজুড়ে।

চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here