মশার ওষুধের কার্যকারিতা পাচ্ছে না ডিএসসিসির নগর বাসি!

0
29

গ্রামীণ টাইমস: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মশার ওষুধের কার্যকারিতা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির একজন কাউন্সিলর। ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষ নজর দেওয়ার জন্য মেয়রের কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন। তার দাবি আগে তার ওয়ার্ডের মানুষ মশারি ছাড়া রাত কাটাতো। এখন মশার ওষুধে কাজ হচ্ছে না।

ওষুধের অকার্যকারিতার বিষয়টি স্বীকার না করলেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, নগরীতে মশা বেড়েছে। তাদের দাবি, শীত মৌসুমে কিউলেক্স মশা বাড়ে। ফাগুনের হাওয়া বইতে শুরু করলে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। মশা নিয়ন্ত্রণে কাজও করছেন তারা।

গত কয়েক মাস ধরেই রাজধানীতে মশা মারাত্মক হারে বেড়েছে বলে অভিযোগ নগরবাসীর। বস্তি থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকাগুলোতেও বেড়েছে মশা। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই শুরু হয় উৎপাত। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে এতে। বাড়ছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও।

এর আগের কয়েক মাস মশার উপদ্রব কিছুটা কম থাকায় ঢাকার দুই মেয়র দাবি করেছিলেন, এবছর মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে। তখন তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন নগরবাসী। কিন্তু সম্প্রতি মশা বেড়ে যাওয়ায় সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের ওপর সন্দেহ বাড়ছে নাগরিকদের। তাদের দাবি যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তা কোনও কাজ করে না।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে মার্চ কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুম। প্রতি বছরের এ সময় প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। মশার প্রজননস্থলগুলো পরিষ্কার করে এ উপদ্রব কমিয়ে আনা সম্ভব।

সেগুনবাগিচা এলাকার বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, বাসায় ঢুকলেই মশারি টাঙিয়ে থাকতে হয়। সিটি করপোরেশনের কোনও কর্মীকে দেখা যায় না। খিলগাঁওয়ের রিকশাচলক হারুন হাওলাদার বলেন, আগে গ্যারেজে রিকশার মধ্যেই ঘুমাতে পারতাম। এখন ত্রিশ সেকেন্ডও দাঁড়ানো যায় না। অথচ মেয়ররা বলেন, মশা নাকি নিয়ন্ত্রণে। আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে মশা এখন বেশি।

মেয়রকে কাউন্সিলরের চিঠি

মশার ওষুধের কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৬৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী মো. ইবরাহীম। মেয়রের কাছে অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ৬৭ নং ওয়ার্ডের জন্য সিটি করপোরেশন কর্তৃক বরাদ্দকৃত মশার ওষুধ যথা নিয়মে প্রতিদিন ছিটানো হচ্ছে। এলাকাবাসীর মন্তব্য ছিল- প্রথমে যে মশার ওষুধ দেওয়া হয়েছিল তার কার্যকারিতা এমন ছিল যে জনগণ মশারি ছাড়া রাত কাটাতে পেরেছিল। কিন্তু এখন ওষুধের সে রকম কার্যকারিতা আমরা পাচ্ছি না।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিন অনেক কাউন্সিলরের ফোন পাই। তারা অভিযোগ করেন, ওষুধ দিলেও কোনও কাজ হয় না। মশা মরে না। তারা ওষুধ ভালো করে পরীক্ষার দাবি করেন।

কাউন্সিলরের এ দাবির সঙ্গে কিছুটা একমত পোষণ করলেও দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, আমরা আগের ওষুধই ব্যবহার করছি। যেসব ওষুধ ইমপোর্ট করা আছে সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন ওষুধ এখনও আসেনি।

তিনি দাবি করেন, এখন বাতাস নেই। এ কারণে কিউলেক্স মশা একটু বাড়ে। ফাল্গুনের এলে আবার কমে যাবে। মশা আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরপরেও আমরা বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিচ্ছি।

আমিন উল্লাহ বলেন, মশার ওষুধ কিন্তু আমরা টেস্ট করি না। এই কাজটা করে থাকে আইইডিসিআর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের প্লান্ট প্রটেকশন। তারা যে ওষুধ সার্টিফাইড করে আমরা সেটাই ব্যবহার করি।

জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, মশা বেড়েছে এটা সত্য। আমিও এখন মশারি টাঙিয়ে ঘুমাই। তবে মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

১০ মাসের ওষুধ সঙ্কট

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ৬ লাখ ৪০ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইডিং ওষুধের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে ডিএসসিসি। তাতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু প্রতিটি কোম্পানি ‘অতিরিক্ত’ দর দেওয়ায় তা বারবার রি-টেন্ডার করে ডিএসসিসি। প্রায় চার দফায় টেন্ডার দিয়ে গতবছরের অক্টোবরের দিকে ওষুধ ফরমুলেশনের কাজ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করতে পারে সংস্থাটি। এই দীর্ঘ সময় সংস্থার কাছে ওষুধ ছিল না। তখন অলস সময় কাটিয়েছিল মশককর্মীরা।

অকার্যকর ওষুধ ফেরত

ডিএসসিসিতে ওষুধ ফরমুলেশনের দায়িত্বে রয়েছে এসিআই ফর্মুলেশন লিমিটেড। কোম্পানিটির সরবরাহকৃত প্রায় এক লাখ লিটার ওষুধ ফিল্ড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় গত বছরের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে তা ফেরত দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে ওই কোম্পানির ফরমুলেশন করা ওষুধই ব্যবহার করছে সংস্থাটি। তবে ফেরত দেওয়া ওষুধ কী করা হয়েছে তা বলতে পারছে না ডিএসসিসি।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যবিভাগের দাবি, মাঠ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া সেই ওষুধ ধ্বংস না করে আবারও ডিএসসিসিতে সরবরাহ করা হয়েছে। তবে ডিএসসিসিতে পরে যতগুলো লট সরবরাহ করা হয়েছে প্রতিটেই ফিল্ড টেস্ট করে গ্রহণ করা হয়েছে।

মশককর্মী কমিয়েছে ডিএসসিসি

মশা বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত কর্মী কমিয়েছে ডিএসসিসি। সংস্থার বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ার্ডে নিয়োজিত নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী রেখে বাকিদের সচিব দফতরে বদলি করা হয়েছে। ডেঙ্গুর এই মৌসুমে কর্মী কমানোকে চরম অবহেলা হিসেবে দেখছেন কীটতত্ত্ববিদ ও নাগরিকরা। তারা বলছেন, যেখানে অর্ধেকের চেয়েও কম জনবল নিয়ে কাজ করছে সিটি করপোরেশন, সেখানে কর্মী কমানো যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। বিশেষ করে এই ডেঙ্গু মৌসুমে সিটি করপোরেশনের এমন সিদ্ধান্তই মশা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটির প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৩ থেকে ১৮ জন করে কর্মী রয়েছে। এ থেকে ৩ থেকে ৭ জন করে কর্মী কমিয়ে সচিব দফতরে বদলি করা হয়। সবকটি ওয়ার্ড থেকে প্রায় ৩০০ জন কর্মীকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে অফিস সহকারী হিসেবে পদায়ন করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ‘অধিকাংশ ওয়ার্ডে অতিরিক্ত জনবল থাকায় তাদের প্রত্যাহার করে ভিন্ন কাজে খাটাচ্ছি।’

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশক নিধনে ওয়ার্ড পর্যায়ে সিটি করপোরেশনের যে জনবল রয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

জনবল কমানো প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনের যেখানে জনবলের ঘাটতি রয়েছে সেখানে ওয়ার্ড থেকে জনবল কমানো কোনও ভাবেই কম্য নয়। একটি ওয়ার্ডের মশা নিয়ন্ত্রণে যে পরিমাণ জনবল থাকা দরকার তার অর্ধেকের চেয়ে কম নিয়ে কাজ করছে সিটি করপোরেশন।

তিনি আরও বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এক জায়গায় যদি ওষুধ দেওয়া হয় নির্দিষ্ট সময় পর সেই জায়গায় আবার ওষুধ দিতে হবে। এক জায়গায় দিলাম, আরেক জায়গায় দিলাম না তা হলে চলবে না।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, একেকটি ওয়ার্ডকে ৮-১০টি সেক্টরে ভাগ করে প্রতি সেক্টরে কমপক্ষে ৪ জন করে জনবল রাখতে বলেছি। এক্ষেত্রে একটি সেক্টরে একজন লারভিসাইডিং, একজন অ্যাডাল্টিসাইডিং এবং একজন পরিস্থিতি কতটা উন্নতি বা অবনতি হয়েছে তা দেখভাল করবে। এলাকার নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক বা যোগাযোগ রাখবে আরেকজন। যাতে তারাও মশক নিয়ন্ত্রণকাজে যুক্ত থাকতে পারে। এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে মশার উৎপাদনস্থল টিকতে পারবে না। এতে প্রতিটি ওয়ার্ডে কমপক্ষে ৩২ থেকে ৪০ জন লোক লাগবে। কিন্তু সেখানে আছে ১২-১৩ জন।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, গতবছর ডেঙ্গুর প্রদুর্ভাবের পর আমরা সিটি করপোরেশনকে কর্মী দিয়েছি, জনবল দিয়েছি, যন্ত্রপাতি দিয়েছি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়েছি। তবে ওয়ার্ড পর্যায় থেকে কর্মী ফেরত আনার বিষয়ে কোনও রিপোর্ট আমার জানা নেই। আমি মনে করে আমরা তাদের যে লোকবল দিয়েছি সেই লোকবল দিয়েই তারা কাজটা করতে পারে। সেই লোকবলের অবসর সময় যদি অন্য কাজে লাগে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু ডেঙ্গু মৌসুমে এটা কোনওভাবে কাম্য নয়।

মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে মশা মারার পরিকল্পনা

বিগত বছরে সিঙ্গাপুর ও দেশের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ঢাকায় মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে পৃথক দুটি আলাদা বিভাগ চালুর উদ্যোগ নেয় দুই সিটি করপোরেশন। এজন্য ঢাকা দক্ষিণের পক্ষ থেকে ‘কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট’ ও উত্তর সিটির পক্ষ থেকে ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’ নামে পৃথক দুটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রকল্পের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এখনও কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘সত্যি কথা হচ্ছে আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছিলাম সেটা নিয়ে এগুতে পারিনি। তবে প্রতিদিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীর সঙ্গে অনেক বৈঠক হয়েছে। আরও বৈঠক করছি। এ ছাড়া মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজও চালিয়ে যাচ্ছি।’

তবে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট করার জন্য বাংলাদেশব্যাপী কাজ করছি। শুধু ঢাকা শহরের দায়িত্ব তো সরকারের না, সরকারের দায়িত্ব সারা দেশ নিয়ে।’

আমরা এখন যদি একটি ম্যানেজমেন্ট সিসেন্টম ডেভেলপ করি সেটা সারা দেশের জন্যই করতে হবে। এমন একটি সিস্টেম করার জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছি। এখন আমাদের সেই আঙ্গিকে কাজ করতে হবে। সিটি করপোরেশনগুলোকে আমরা জনবল দিচ্ছি। এন্টোমলজিস্টসহ অন্যান্য জনবলও দেওয়া হচ্ছে।

(সূত্র-বাংলা ট্রিবিউন)

-এমএসআইএস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here