ক্রেতারা কী চায় তা খুবই ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম ওয়ালটন ও ইভ্যালি

0
51

গ্রামীণ টাইমস: দেশীয় ইলেকট্রনিক ও অটোমোবাইল পণ্যের বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য তৈরি করে সবার আবেগ ছুঁয়েছে ওয়ালটন। ফলে স্বল্প সময়েই একটি সফল কোম্পানি হিসেবে নাম লিখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতিমধ্যে বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে ওয়ালটন। পুঁজি বাজারেও প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির দেশের বাজারে প্রবেশের বয়স খুব বেশি দিনের নয়। তবুও ব্র্যান্ডটি এখন উজ্জ্বল। ইভ্যালি কর্তৃপক্ষের দাবি দেশীয় ই-কমার্সের অর্ধেকের বেশি অংশ তাদের দখলে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রেতারা কী চায় তা খুবই ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান দুটি। বিপণনেও এগিয়ে তারা। ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর বিশেষ কৌশল অবলম্বন করছে প্রতিষ্ঠান দুটি। তরুণসহ সব বয়সীদের প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার যোগান দিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি এখন শীর্ষে। দেশে মিডল অ্যান্ড অ্যাডভান্স কনজ্যুমার বাড়ছে। ফলে দুটি প্রতিষ্ঠানই তা ধরতে সক্ষম হয়েছে। ফলে সাফল্যও পেয়েছে তারা।

ওয়ালটনের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৭৭ হলেও প্রতিষ্ঠানটি ইলেক্ট্রনিকস ও অটোমাবাইল ব্যবসায়ে প্রবেশ করে ২০০০ সালে। বর্তমানে এটি বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি। অন্যদিকে ইভ্যালি বাজারে এসেছে ২০১৮ সালে। ইভ্যালি কর্তৃপক্ষ জানান, ওই বছর এবং ২০১৯ সালে সবকিছুতেই ইভ্যালির গ্রোথ ছিল ১০ গুণ। আর ২০২০ সালে ইভ্যালির গ্রোথ এক হাজার শতাংশ।

২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ব্র্যান্ড হওয়ার লক্ষ্য ওয়ালটনের

ওয়ালটনের আজকের অবস্থানে উঠে আসার পেছনে শীর্ষে রয়েছে রেফ্রিজারেটর। এরপরে রয়েছে টেলিভিশন, এয়ারকন্ডিশনার, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইলফোন, হোম অ্যাপ্লায়েন্স ইত্যাদি। আর এসবের মিলিত ফসল ওয়ালটন এখন বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠান।

তবে ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ মনে করেন, ওয়ালটনের প্রতিটি পণ্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পণ্যে ক্রেতাদের আস্থা রয়েছে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার (পিসি), মোবাইলফোন ইত্যাদি পণ্যের কারণে তরুণদেরও পছন্দ ওয়ালটন ব্র্যান্ড। এছাড়া হোম অ্যাপলায়েন্স পণ্য পরিবারে প্রবেশ করে যাওয়ায় ওয়ালটন এখন পারিবারিক ব্র্যান্ডও।

ওয়ালটনের নির্বাহী পরিচালক উদয় হাকিম বলেন, ওয়ালটনের আজকের অবস্থানের পেছনের কারণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের নির্ভরতা এবং ভালোবাসা। সেই সঙ্গে দেশের প্রতিটি মানুষের সহায়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা। ওয়ালটনের উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষ যেন সাশ্রয়ী দামে সেরা মানের ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তি পণ্য কিনতে পারে। পণ্যের মানের ব্যাপারে ওয়ালটন কখনও আপস করে না। তিনি জানান, ওয়ালটনের নীতি হলো ‘ফিট ফর অল’ অর্থাৎ সব শ্রেণি-পেশার ক্রেতাদের জন্য উপযুক্ত পণ্য তৈরি করা। এজন্য পণ্যের মান উন্নয়ন ও গবেষণায় ব্যাপক জোর দেয় ওয়ালটন। ফলে দেশের মানুষের মনে যেমন ওয়ালটন জায়গা করে নিয়েছে।

কেন অন্যদের থেকে ওয়ালটন আলাদা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ যুক্ত পণ্য দিয়ে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে ওয়ালটন।

তিনি জানান, ওয়ালটন সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে আরঅ্যান্ডডি বা গবেষণা ও উন্নয়নে। দেশ-বিদেশের প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে গঠিত ওয়ালটনের আরঅ্যান্ডডি টিম দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বৃহৎ। এত বড় আরঅ্যান্ডডি টিম বিশ্বের খুব কম প্রতিষ্ঠানের আছে। এছাড়া ওয়ালটন পণ্যের ‘বৈচিত্র্য’ বেশি। বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের রুচি, চাহিদা ও ক্রয় সক্ষমতা অনুসারে ওয়ালটন পণ্য উৎপাদন করে। আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়া। এজন্য সব বিভাগেই সমান গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে আমরা কাজ করছি।

সময়কে ধরে সফল ইভ্যালি

ইভ্যালির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল বলেন, আমি দুটো তত্ত্ব সব সময় মেনে চলি। এক. কোনও কিছুতে সাড়া ফেলতে হলে ‘আউট অব দ্য বক্স’ চিন্তা করতে হবে। কনভেনশনাল পথে চিন্তাভাবনা করলে হবে না তাতে ‘ইনোভেশন’ থাকতে হবে। দুই. কারও জন্য কিছু করলে প্রতিদান পাওয়া যায় বেশি। ক্রেতাদের জন্য কিছু করা, কর্মীদের জন্য কিছু করলে তা দ্বিগুণ বা তারও বেশি হয়ে ফেরত আসে। এই দুই নীতিই আমার বা ইভ্যালির সাফল্যের পেছনে নিয়মক হিসেবে কাজ করেছে।

তিনি বলেন, আমরা ডিস্ট্রিবিউশন সমস্যার সমাধান করেছি। যে পণ্য বিক্রি করি তা সর্বোচ্চ সংখ্যক তথা সবার চেয়ে বেশি বিক্রি করতে চাই। আমরা নাম্বার ওয়ান হতে চাই। যে পণ্যই বিক্রি করি না কেন, সেই পণ্যের বাজারের অন্তত ৫০ শতাংশ শেয়ার আমাদের দখলে থাকতে হবে। এতে করে সাপ্লাইয়াররাও খুশি থাকে। একটা ‘বাল্ক অ্যামাউন্ট’ বিক্রির নিশ্চিয়তা পেলে তারা আমাদের কেন পণ্য দেবে না। আমরা যে মোবাইলফোন বিক্রি করি, যে মোটর বাইক বিক্রি করি তার মার্কেট শেয়ারের বড় একটা অংশ আমাদের দখলে। তিনি মনে করেন, এতে কম দামে পণ্য কিনে ক্রেতাদের কাছে কমে বিক্রি করা যায়। মার্কেট শেয়ার বেশি হলে তা ক্রেতা বা বিক্রেতা- দুই পক্ষেই আস্থা তৈরি করে।

তিনি মনে করেন, সময়ও একটা বড় ফ্যাক্টর। সময় বা ট্রেন্ড কী চায় তা যদি বোঝা যায় তাহলে সাফল্য পেতে সময় লাগে না। তিনি জানান, তরুণরাই ইভ্যালির বড় ক্রেতা। তরুণরা কি চায়, কোনও ধরনের পণ্যে তাদের আগ্রহ আছে, তারা কিভাবে দাম পরিশোধ করতে চায়, কি ধরনের ওয়ালেট তাদের পছন্দ, তারা যে কেনাকাটায় ছাড় পায় সে ছাড় দিয়ে কী করতে চায়- এসব বিষয় জরিপ করে, যাচাই করেই তবে আমরা সিদ্ধান্ত নিই কী ধরনের পণ্য আমাদের সাইটে উপস্থাপন করবো।

প্রতিষ্ঠান দুটির সফলতা, বাজার, অর্থনীতিতে অবদান ইত্যাদি বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, কোম্পানি দুটির সফলতার জাদুটা হলো আমাদের দেশের মানুষের আয় বেড়েছে। ফলে চাহিদা বেড়েছে। মানুষ এখন স্বাচ্ছন্দ্য চায়, অবকাশ যাপন করতে চায়। এসব বিষয়গুলো ভালোমতো বুঝতে পেরে কোম্পানি দুটি ক্রেতাদের সামনে পণ্য নিয়ে সেভাবে উপস্থাপন করছে। মানুষ কমদামে ফ্রিজ কিনে তাতে সবজি, খাবার সংরক্ষণ করতে পারছে। কমদামে রঙিন টিভি কিনতে পারছে। তারা বিনোদন লাভ করছে। তাদের জীবনযাপনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তিনি জানান, দেশের অর্থনীতিতে ‘স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন’ যুগের সূচনা হয়েছে। ‘মিডল অ্যান্ড অ্যাডভান্স কনজ্যুমার’ বাড়ছে। এই শ্রেণির যে চাহিদা তা ওয়ালটন ধরতে পেরেছে বলে প্রতিষ্ঠানটি সফল হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে। অনলাইন অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, পেমেন্ট সিস্টেম উন্নত হয়েছে, লেনদেনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কাজ করছে, সর্বোপরি দেশে ডিজিটাল ইকোনমি প্রসারিত হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম সেটা লুফে নিয়ে অনলাইনেই সব সেরে ফেলতে চাইছে। তারা অনলাইনে বেশি সময় কাটাচ্ছে। তরুণরা কী চায় তা অন্যান্য ই-কমার্সের চেয়ে ইভ্যালি ভালো বুঝতে পারছে, তারা তরুণদের কাছে সেই ধরনের উদ্ভাবনী অফার নিয়ে হাজির হচ্ছে যা অন্য কোম্পানি সেভাবে পারছে না বলে ইভ্যালি সফল হয়েছে।

সূত্র-বাংলা ট্রিবিউন

-এমএসআইএস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here